স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশ-চীন মেলবন্ধন | Barta Bazar

বাংলাদেশ ও চীনের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অনেকটাই মজবুত। ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব, কৌশলগত সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা খাতেও দুই দেশের সম্পর্কে নতুন মাত্রা যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশে উন্নত চিকিৎসাসেবা ও প্রযুক্তির অভাব দূরীকরণে চীনের উন্নত চিকিৎসা সুবিধা গ্রহণ ও সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপড়েনের কারণে বাংলাদেশের নাগরিকরা বিশেষ করে জটিল ও ব্যয়বহুল চিকিৎসার জন্য চীনের উন্নত হাসপাতাল ও চিকিৎসা প্রযুক্তির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন, যা স্বাস্থ্যসেবায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে।

ঢাকায় চীনের দূতাবাস বাংলাদেশি নাগরিকদের চিকিৎসা ভিসা প্রদান প্রক্রিয়াকে সহজ ও দ্রুত করার পদক্ষেপ নিয়েছে, যাতে রোগীরা সময়মতো চিকিৎসার সুযোগ পেতে পারেন।

বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবার মান ও সুযোগের ঘাটতি রয়েছে। এখনো দেশের অনেক অঞ্চলে উন্নত হাসপাতাল, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও আধুনিক চিকিৎসা যন্ত্রপাতির অভাব প্রকট। বিশেষ করে জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় সুবিধা না থাকায় অনেকেই চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। এক্ষেত্রে ভারত ছিল প্রধান গন্তব্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় ভিসা প্রক্রিয়া ও অন্যান্য নীতিগত সমস্যার কারণে এই প্রবণতায় পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে।

উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি, আধুনিক হাসপাতাল অবকাঠামো ও উচ্চমানের চিকিৎসা পরিষেবার জন্য সারা বিশ্বেই সুনাম রয়েছে চীনের। কুনমিং, ইউনান ও অন্যান্য প্রদেশের শীর্ষস্থানীয় হাসপাতালগুলোয় উন্নত চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষিত ডাক্তার ও আধুনিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে। বাংলাদেশের সরকারি পর্যায় থেকে চীনের উন্নত চিকিৎসাসেবা গ্রহণের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে চিকিৎসার পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যসেবায় আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের নাগরিকদের উন্নত চিকিৎসাসেবা দিতে চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিংয়ের শীর্ষস্থানীয় হাসপাতালগুলোকে বেছে নেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউনান ফুয়াই কার্ডিওভাস্কুলার হাসপাতাল, কুনমিং মেডিকেল ইউনিভার্সিটির প্রথম উপাধ্যক্ষ হাসপাতাল এবং অন্যান্য প্রধান হাসপাতালে বাংলাদেশি রোগীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই হাসপাতালগুলোয় উন্নত প্রযুক্তি, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ও সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা প্রোটোকল অনুসরণ করে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। চীনের উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি ও পরিকাঠামোর সাহায্যে বাংলাদেশি রোগীরা আরো দ্রুত, নির্ভুল ও সুলভ চিকিৎসা পাবেন। বিশেষ করে হৃদরোগ, ক্যানসার, নিউরোলজিক্যাল সমস্যা ও জটিল সার্জারির ক্ষেত্রে উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যবহারে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হবে। ভারতসহ অন্যান্য দেশে চিকিৎসার খরচ ও সময়ের তুলনায় চীনে চিকিৎসা গ্রহণ করা আরো সুলভ ও সুবিধাজনক হবে।

স্বাস্থ্যসেবা খাতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি শুধু বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ বৃদ্ধি করবে না, বরং এআই-ভিত্তিক রোগ নির্ণয়, রোবোটিক সার্জারি, টেলিমেডিসিন ও আধুনিক গবেষণা পদ্ধতির মাধ্যমে বাংলাদেশি ডাক্তাররা তাদের দক্ষতা বাড়াতে পারবেন। এতে ভবিষ্যতে দেশের অভ্যন্তরীণ চিকিৎসাসেবার মানও বাড়বে, যা ভবিষ্যতে দেশের চিকিৎসা খাতকে আত্মনির্ভরশীল হতে সহায়ক হবে। চীনের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশি চিকিৎসক, নার্স ও প্রযুক্তিবিদরা আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি ও গবেষণায় দক্ষতা অর্জন করবেন। প্রশিক্ষণ, ওয়ার্কশপ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে দেশে উচ্চমানের চিকিৎসাসেবা প্রদান করা সম্ভব হবে।

চীনের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের মাধ্যমে ঢাকায় বা অন্যান্য প্রধান নগরীতে আধুনিক চিকিৎসা কেন্দ্র ও হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যা দেশীয় চিকিৎসাসেবাকে আরো উন্নত করবে।

স্বাস্থ্যসেবা খাতে সহযোগিতা বাংলাদেশ ও চীনের সামগ্রিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরো মজবুত করবে। এই সহযোগিতা শুধু চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং অর্থনীতি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ও নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। দুই দেশের মধ্যে ৫০ বছরের কূটনৈতিক সম্পর্ক উদ্‌যাপনের সঙ্গে নতুন নতুন উদ্যোগের সূচনা করা হয়েছে, যা পারস্পরিক বিশ্বাস, সহযোগিতা ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

চীনের হাসপাতালগুলোর অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা-সংক্রান্ত যোগাযোগ ইংরেজি বা চীনা ভাষায় হয়ে থাকে। বাংলাদেশি রোগীদের জন্য এই ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে। তবে দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে দোভাষী ও অনুবাদক সেবা প্রদানের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

স্বাস্থ্যসেবায় চীনের সঙ্গে মেলবন্ধন চিকিৎসাসেবার মান উন্নত করার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি, সহজ ভিসা প্রক্রিয়া ও বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতকে আরো আধুনিক করা সম্ভব হবে। চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতা শুধু চিকিৎসা খাতে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রতিটি ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

লেখক : শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *