তলোয়ার ও গলার মধ্যে কোনো শান্তি আলোচনা হয় না: উমামা ফাতেমা

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখপাত্র উমামা ফাতেমা আজ (২ এপ্রিল) তার ভেরিফাইড ফেসবুক পোস্টে গাসান কানাফানির (পিএফএলপি নেতা) কথা উল্লেখ করে বলেন, ফিলিস্তিনি ইস্যু কেবল ফিলিস্তিনিদের সমস্যা নয়, এটি প্রতিটি বিপ্লবীর সমস্যা।তিনি জানান, জুলাইয়ের আন্দোলনে আমরা গাসান কানাফানির “তলোয়ার ও গলার মধ্যে কোনো শান্তি আলোচনা হয় না” কথায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম।

জনকণ্ঠের পাঠকদের জন্য উমামা ফাতেমার স্ট্যাটাসটি হুবহু বাংলায় তুলে ধরা হলো:

“এটি কখনোই ‘জমির জন্য সংঘর্ষ’ ছিল না। ইসরায়েল যে নৃশংসতা চালিয়েছে, তা নিখুঁতভাবে দখলদারিত্বের উদাহরণ এবং আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের প্রতিচ্ছবি। যদি ফিলিস্তিনি নারী ও শিশুদের দুর্ভোগ আপনাকে স্পর্শ না করে, কিন্তু ৭ অক্টোবরের বন্দিদের জন্য আপনি ‘মিথ্যা অশ্রু’ ঝরাতে পিছপা না হন, তবে সেটি সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য।

জুলাইয়ের আন্দোলনে আমরা গাসান কানাফানির (পিএফএলপি নেতা) কথায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম—”তলোয়ার ও গলার মধ্যে কোনো শান্তি আলোচনা হয় না।” এটি কোনো ধর্মীয় যুদ্ধ ছিল না, যেমনটা পশ্চিমারা প্রচার করে।

আমি যখন জুলাইয়ে লড়াই করেছিলাম, তখন সেটি শুধুই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ছিল না। আমি ফিলিস্তিনের ‘ইন্তিফাদা’কে স্মরণ করেছিলাম—যেখানে নিরস্ত্র মানুষ উন্নত সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশেও তাই ঘটেছিল।

স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ইট, পাথর, টিনশেড, লাঠি নিয়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং নিজেদের দেশের সশস্ত্র নাগরিকদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। অন্যদিকে, তারা ছিল চীনা রাইফেল, শটগান ও অন্যান্য প্রাণঘাতী অস্ত্রের সজ্জায় সজ্জিত। ইতিহাসের কোনো এক পর্যায়ে জনগণের সংগ্রাম একই বিন্দুতে এসে মিলিত হয়, আর সেটাই আমরা দেখেছি।

যদি আমরা অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে চাই, তবে ফিলিস্তিন ইস্যুকে পাশ কাটানো যাবে না। ৮০ বছর ধরে ‘নাকবা’র পর ফিলিস্তিনিরা পশ্চিমা শক্তির দমননীতি ও আরব বিশ্বের নীরবতার বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে। পূর্বপুরুষের ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে, তারা নিজেদের পরিচয়ের জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।

তাই, আপনার ‘মিথ্যা অশ্রু’র প্রতি আমার কোনো সহানুভূতি নেই। এটি কখনোই কোনো ‘সংঘর্ষ’ ছিল না—এটি নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক অবিরাম লড়াই।

কিছু মানুষ আমাকে ভণ্ড বা জনপ্রিয়তা খোঁজার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। কিন্তু আমি এসব পরোয়া করি না। আমি জুলাই মাসে হঠাৎ আবির্ভূত হইনি—গত ৭-৮ বছর ধরে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাস্তায় ছিলাম। যদি আমি জনপ্রিয়তা চাইতাম, তাহলে আরও অনেক সহজ পথ ছিল তা অর্জনের।

আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা আমাকে আত্মমর্যাদা ও সম্মানের বরকত দিয়েছেন। আমি আমার নিজস্ব কাজ করতে পারি এবং সম্মান ও নৈতিকতা বজায় রেখেই সামনে এগিয়ে যেতে পারি। আমি ‘প্রো-ফিলিস্তিন’ পরিচয়কে জনপ্রিয়তা অর্জনের হাতিয়ার বানানোর প্রয়োজন মনে করি না।

আমি এই পুরস্কারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি, কারণ আমি সত্যিই অনুভব করেছি যে গণহত্যার সহযোগীদের পাশে থাকা আমাদের সংগ্রামের—গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও নাগরিকত্বের স্বীকৃতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই আমি এটি প্রত্যাখ্যান করেছি।

যারা আমার এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে এবং পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। হয়তো বিশ্বপর্যায়ে এই প্রত্যাখ্যানের খুব একটা মূল্য নেই, কিন্তু আমাদের অবশ্যই ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এক নৃশংস স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আমাদের গৌরবময় সংগ্রামের পর এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গাসান কানাফানি বলেছিলেন— “ফিলিস্তিনি ইস্যু কেবল ফিলিস্তিনিদের সমস্যা নয়, এটি প্রতিটি বিপ্লবীর সমস্যা, যেখানে সে-ই থাকুক না কেন। এটি আমাদের সময়ের শোষিত ও নিপীড়িত জনগণের সংগ্রাম।”

তাই, যদি আমরা সত্যিকারের পরিবর্তন চাই, তবে আমাদের মর্যাদাবান হতে হবে। তথাকথিত রাজনৈতিক সমীকরণকে উপেক্ষা করে, আমাদের—শিক্ষার্থীদের—অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *